কেমন গেল আমার ২০২০ সাল

এক কথায় ভালো গেছে। সম্ভবত জীবনের সেরা বছর ছিল। বলার মতো খারাপ কিছু ঘটেনি। বরং, বেশ কিছু ভালো ভালো ব্যাপার ঘটেছে।

প্রথমত, আমার মেয়ে। অক্টোবরে মেয়ে হয়েছে। এটা অন্যরকম একটা ব্যাপার।

দ্বিতীয়ত, ব্যবসা। কোম্পানির পরিধি বেড়েছে। এইতো সেদিন একা শুরু করলাম, এখন আমার টীমে সদস্য সংখ্যা দশ! রেভিন্যু হয়তো সেই হারে বাড়েনি। কিন্তু এটাই তো শেষ কথা নয়।

তৃতীয়ত, গাড়ি। খানিকটা প্রয়োজনে আর অনেকটা শখের বশে একটা গাড়ি কিনে ফেলেছি।

আশা করছি ২০২১ সাল আরও ভালো যাবে ইনশাআল্লাহ।

সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা। আল্লাহ সবার সহায় হোন।

মূর্তি, ভাস্কর্য এবং অন্যান্য

ভূমিকা

রাজনীতি কখনোই আমার আগ্রহের বিষয় নয়। আমি সচেতনভাবে এবং ঘৃণাভরে রাজনীতি ও রাজনীতি সংশ্লিষ্ট মানুষদের থেকে দূরে থাকি। আমি সংগ্রামী মানুষ। জীবিকার জন্যে আমাকে ঘাম ঝরাতে হয়। রাজনীতি নিয়ে সময় নষ্ট করার মতো বিলাসিতা আমার মানায় না।
একজন মানুষ যখন সদর্পে ঘোষণা করেন, আমি অমুক দলের সমর্থক; চট করে সেই মানুষটা সম্পর্কে, তাঁর চিন্তাধারা সম্পর্কে একটা নেতিবাচক ধারণা চলে আসে। দেশের রাজনীতির যে অবস্থা, তাতে কেউ যখন নিজেকে একটা নির্দিষ্ট দলের অনুসারী বলেন, তখন তাঁর বিবেকবোধ নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক বৈকি। সেটা আওয়ামীলীগ থেকে বিএনপি, জামাত থেকে হেফাজত – সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
বলা-ই বাহুল্য, বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলো অন্তঃসারশূন্য। রাজনৈতিক আদর্শ বলে যে একটা কথা ছিল, সেটা এখন কাজির গরু – কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই।
আমার এক পরিচিতজন, যিনি একটা রাজনৈতিক দলের উচ্চ পর্যায়ের নেতা, তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, একজন মানুষ অন্য দল না করে আপনাদের দল কেন করবে? অন্যদের সাথে আপনাদের পার্থক্য কী? তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি। শুধু বললেন, আমাদের আদর্শের জন্যে! খুবই হাস্যকর উত্তর। কোনো দলের আদর্শই চুরি করতে বা খারাপ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে না।
আমার দৃঢ় বিশ্বাস, কোনো রাজনীতিবিদই আমার এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন না।
আচ্ছা, মূর্তি-ভাস্কর্য নিয়ে আলোচনা করতে এসে রাজনীতির প্যাঁচাল কেন শুরু করলাম!? করলাম, কারণ এ সংক্রান্ত সাম্প্রতিক যে উত্তেজনা, সেটা যতোটা না ধর্মীয়, তারচেয়ে বহুগুণ বেশি রাজনৈতিক। ব্যাখ্যা করছি।
যাঁরা বলছেন, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য বানানো যাবে না, ভাস্কর্য বানানো ধর্মে নিষিদ্ধ; তাঁরা কি কখনো মাজার নিয়ে কথা বলেছেন? কখনো পীর-ভন্ডদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন? দেননি। এমনকি দেশে যে ইতোমধ্যে বিভিন্ন ব্যক্তির শতশত ভাস্কর্য আছে, সেগুলো নিয়েও তো বলতে দেখলাম না! তাহলে বঙ্গবন্ধু ইস্যুতে তাঁরা এতো উত্তেজিত কেন? কারণ, যেকোনো উপায়ে আওয়ামীলীগ সরকারের বিরোধিতা করতে হবে। এখানে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব।
আবার যাঁরা বলছেন, ভাস্কর্য বানানো যাবে, তাঁরা কি ধর্মের বিধিনিষেধ জেনে তারপর বলছেন? দুই লাইন কুরআন-হাদিস পড়েছেন? এঁদের অধিকাংশই কোনো হাদিস গ্রন্থ চোখেই দেখেননি। তাহলে কেন বলছেন? কারণ, হুজুররা ভালো-মন্দ যা-ই বলবে সেটার বিরোধিতা করাই হচ্ছে সেক্যুলারিজম, স্মার্টনেস। এটাও রাজনৈতিক স্বার্থের বিষয়।
ইসলামে মূর্তি বানানোর ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আছে -খুব সম্ভবত এ ব্যাপারে কারও দ্বিমত নেই। দ্বিমত হচ্ছে, মূর্তি বনাম ভাস্কর্য নিয়ে। ভাস্কর্য বানানো যাবে কিনা, আরও সূক্ষ্ম করে বললে- ভাস্কর্য আর মূর্তি একই বিষয় কিনা?

মূর্তি কী?

মূর্তি শব্দটির উৎস হচ্ছে- মূর্ত (√ মূর্ছ + ত)। খুবই পরিচিত শব্দ। মূর্ত অর্থ প্রত্যক্ষ বা স্পষ্ট হওয়া। কাছাকাছি আরেকটি অর্থ হচ্ছে, আকার ধারণ করা যেটাকে ইংরেজিতে বলা হয়েছে embody (এমবডি)। আপনারা “মূর্ত প্রতীক” কথাটা অবশ্যই শুনে থাকবেন।
আর মূর্তি হল সেই বস্তু, যা মূর্ত হয়েছে বা মূর্ত করা হয়েছে। মূর্তি শব্দের অর্থ- আকৃতি, দেহ, চেহারা, আকার, প্রতিমা। (শেষের অর্থটা খেয়াল করুন, এখানেই গোলমালটা লেগেছে!) ইংরেজিতে- Shape, form, figure, body, image, idol.
তবে প্রচলিত ক্ষেত্রে মূর্তি দ্বারা মানুষের (বা কোনো প্রাণীর) মূর্তিই বুঝানো হয়ে থাকে। হিন্দুরীতিতে দেব-দেবী বা সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মূর্তিগুলো এর উদাহরণ।

ভাস্কর্য কী?

উইকিপিডিয়ার মতে-

ত্রি-মাত্রিক শিল্পকর্মকে ভাস্কর্য বলে। অর্থাৎ, জ্যামিতিশাস্ত্রের ন্যায় ভাস্কর্যকে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ এবং গভীরতা সহ ত্রি-মাত্রিক হতে হবে। … পুতুল, মুখোশ, মাটির জিনিসপত্র ভাস্কর্যের উদাহরণ।

মূল কথা হচ্ছে, ত্রি-মাত্রা বা 3D হল ভাস্কর্যের বৈশিষ্ট্য। আপনি যখন কাগজে কারও ছবি আঁকবেন, সেটা ভাস্কর্য হবে না। যদি কাদামাটি দিয়ে অবয়ব তৈরি করেন, সেটা হবে ভাস্কর্য।

মূর্তি আর ভাস্কর্য কি একই?

জ্বি, একই জিনিস। শাব্দিক অর্থের কিছুটা পার্থক্য থাকলেও প্রায়োগিক ক্ষেত্রে মূর্তি আর ভাস্কর্য একই বস্তু।
আপনি যখন কোনো মানুষের ভাস্কর্য বানাবেন, সেটা হবে মূর্তি। যদি গাছের ভাস্কর্য বানান, সেটাকে অভিধানমতে মূর্তি বলা গেলেও, পারিভাষিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূর্তি বলা হয় না।

এবং প্রতিমা

গোলমালটা লেগেছে এখানে। হিন্দু ধর্মের অনুসারীরা প্রতিমার পূজা করে থাকেন। (এখানেও একটা মিসকনসেপশন আছে। হিন্দুরা আসলে প্রতিমাকে রূপক-মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে ভগবানের পূজা করেন।) আর যেহেতু প্রচলিতভাবে প্রতিমাকে মূর্তি বলা হয়, আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজ এবার ঘাবড়ে গেছেন। কীভাবে সামাল দেওয়া যায় উপায় বের করতে না পেরে মূর্তি আর ভাস্কর্যের মধ্যে পার্থক্য করে দেওয়ার একটা মিথ্যা চেষ্টা করলেন। আর আমাদের মহাশিক্ষিত হুজুররা গেলেন ক্ষেপে!
এই বিষয়টা খুবই স্পষ্ট। বিভ্রান্ত হওয়ার সুযোগ নেই। যে মূর্তির উপাসনা করা হবে, সেটাই প্রচলিত অর্থে প্রতিমা।

তাহলে?

নাম আলাদা করে ফেললেই জিনিস আলাদা হয়ে যায় না। আমি যেটাকে ভাত বলি, এলিট শ্রেণি রেস্টুরেন্টে গেলে সেটাকে বলে রাইস। তেমনি আলাদা হয় না উদ্দেশ্যের ভিন্নতা থাকলেও। যেটা দিয়ে আপনি পশু জবাই করেন, সেটাও ছুরি। ছিনতাইকারী যেটা পেটে ঢুকিয়ে দেয়, সেটাও ছুরি।
এই সাম্প্রতিক কালে এসে ভাস্কর্য আর মূর্তি আলাদা হয়ে গেছে। কিছুদিন আগেও বুদ্ধিজীবীরা এই দুইটা শব্দ দিয়ে একই জিনিস বুঝাতেন। আগে বিভিন্ন বিশিষ্টজনদের যে মূর্তিগুলো তৈরি হতো, সেগুলোকে মূর্তিই বলা হতো।
কিছু জ্বলন্ত উদাহরণ দেই-

 
অন্যদেরটা ‘মূর্তি’ই থাকল আর বঙ্গবন্ধুরটা ‘ভাস্কর্য’ হয়ে গেল কেন, কে জানে! বঙ্গবন্ধুর মতো একজন অবিস্মরণীয়, অসামান্য মানুষকে নিয়ে আর কতো রাজনীতি করতে হবে?!
আর এরকম একটা বিষয়কে ইসলামাইজ কেন করতে হবে সেটাও বুঝি না! ভাস্কর্য ইসলামে নিষিদ্ধ প্রমাণ হলে কি সরকার বঙ্গবন্ধুর ‘ভাস্কর্য’ বানাবে না? দেশে আর কোনো ভাস্কর্য তৈরি হবে না? এদেশে কি ইসলামের বাইরে কিছু হয় না?

আমি কীভাবে সময় নিয়ন্ত্রণ ও কাজ বণ্টন করি

এক পরিচিত জুনিয়র সেদিন জিজ্ঞেস করল, আমি ক্লায়েন্ট থেকে পরিবার, টীম থেকে কাস্টমার -সবকিছু কীভাবে সামলাই!
সত্যি কথা হল, আমি সবকিছু ঠিকঠাক সামলাতে পারি না। পারা যায় না। কিছু না কিছু এলোমেলো হয়ই। তারপরও, যেকোনোভাবেই হোক, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আমি দিনের কাজ দিনে শেষ করি। কখনো কখনো পরেরদিনের কাজও আগেরদিন করে ফেলতে পারি।
সেটা কীভাবে করি?
১) আর্লি টু রাইজ
আমার দিন শুরু হয় বেশ সকালে। সকাল সকাল দিন শুরু করতে পারাটা অসম্ভব উপকারী। আমি যখন অফিসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই, তখন ঢাকা শহরের একটা মোটাদাগের মানুষ বিছানায় থাকে। অফিসে যাই সবার আগে। উত্তরা থেকে মিরপুর অনেক দূর পথ, তারপরও অধিকাংশ দিনই সাড়ে সাতটার মধ্যে অফিসে পৌঁছাই।
২) জিমেইল
ঘুম ভাঙ্গার পর প্রথম যে কাজটা করি, সেটা হল মেইল চেক করা। জরুরী কোনো মেইল আছে কিনা দেখি, উত্তর দেওয়ার দরকার হলে উত্তর দিয়ে দেই। বাকি মেইলগুলো গাড়িতে বসে দেখি। প্রয়োজন অনুসারে আলাদা লিস্টে যোগ করি।
৩) মাইক্রোসফট টু ডু (Microsoft To Do)
টু-ডু ম্যানেজ করার অনেকগুলো টুল আছে। তবে আমার পছন্দ এটা। কাজ গ্রুপ করার পাশাপাশি রিমাইন্ডার এ্যালার্ম দেওয়ার ব্যবস্থা আছে।
৪) ট্রেলো (Trello)
প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের জন্যে দুর্দান্ত একটা টুল। আলাদা আলাদা বোর্ড তৈরি করা যায়। লিস্ট, কার্ড, চেকলিস্ট ইত্যাদিসহ চমৎকার সব ফিচার আছে।
৫) ক্যালেন্ডলি (Calendly)
প্রায়ই ক্লায়েন্টদের সাথে মিটিং করতে হয়। বেশিরভাগ সময়ই দেখা যায়, সময় নির্ধারণ করা নিয়ে ঝামেলা হচ্ছে। টাইমজোন নিয়েও ভুল বোঝাবুঝি হয়। কোন কোন সময় আমি ফ্রি থাকব, সেটার তালিকা থাকে। ক্লায়েন্টরা নিজের টাইমজোন মেনে সুবিধাজনক সময় নির্বাচন করতে পারেন।
৬) গুগল ক্যালেন্ডার
কারও জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী থেকে শুরু করে ক্লায়েন্ট মিটিং -সবকিছু মনে করিয়ে দিতে গুগল ক্যালেন্ডারের জুড়ি নেই। নির্ধারিত সময়ের আগেই মেইল দিয়ে জানিয়ে দেয়। আমার ক্যালেন্ডলিতে যোগ করা শিডিউলগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে এখানে যুক্ত হয়।
৭) স্ল্যাক (Slack)
টীমের সাথে যোগাযোগের অতুলনীয় টুল। চ্যানেল তৈরি করা, প্রাইভেট চ্যাটিং বা ফাইল এ্যাটাচ করা, কথা বলা সহ দরকারি সবকিছুই আছে।
৮) স্কাইপ
মূলত ক্লায়েন্টের সাথে কথা বলতে ব্যবহার করি। ইউএসএ-তে আমাদের টিম মেম্বার আছেন। তাঁর সাথে কথা বলতেও স্কাইপ ব্যবহার করি।
৯) হ্যাংআউটস (Hangouts)
খুব কম ব্যবহার করা হয়। অনেকেই স্কাইপ-এর চেয়ে হ্যাংআউটস বেশি পছন্দ করেন। তাঁদের সাথে কথা বলতে গেলে ব্যবহার করি।
১০) ইউটিউব ডাউনলোড
ইউটিউবের এই ফিচারটা মাঝে মাঝে কাজে দেয়। হয়তো একটা ভিডিও দেখব, সময় নেই। এটা ডাউনলোড করে রাখি। বাসায় ফেরার পথে গাড়িতে বসে দেখে ফেলি।
১১) ক্লাউড সিংক্রনাইজেশন
আমার সবকিছু সবকিছুর সাথে সংযুক্ত। কোড থাকে বিটবাকেটে, অন্যান্য ফাইল রাখি গুগল ড্রাইভে, ব্রাউজার সিংক করা থাকে। একটা দরকারি কিছু অফিসের কম্পিউটারে আছে, বাসায় এসে কাজ করতে পারছি না -এমন খুব কম হয়।
সর্বোপরি, চেষ্টা করি সময় নষ্ট না করতে। আমার সারাদিনে বিনোদন বাবদ দুই মিনিট সময়ও বরাদ্দ থাকে না।
ভাবলাম, সবার সাথে শেয়ার করি। যদি কারও কাজে আসে। কারও ভালো কোনো টুলের খোঁজ থাকলে জানাতে পারেন।
(সাথে যুক্ত করা ছবির আইডিয়াটা ব্রায়ান ট্রেসির ইট দ্যাট ফ্রগ থেকে পাওয়া!)

মনডায় চায়- ৩

আমরা অনলাইনে আবেদন করতে বলি। একটা ফর্ম থাকে, সেখানে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে আবেদন করতে হয়। কখনো কখনো সিভি বা রেজুমে এ্যাটাচ করতে বলা হয়।

আলাদা আলাদা পদের জন্যে আবেদন ফর্ম আলাদা হয়ে থাকে। তবে কিছু তথ্য আমরা সবাইকেই জিজ্ঞেস করি। নাম-ধামের পাশাপাশি জন্মতারিখ, লিঙ্গ, কবে থেকে জয়েন করতে পারবেন, বেতন-চাহিদা -এসবও চাওয়া হয়। মাঝে মাঝে প্রার্থীর ফেইসবুকের লিংক শেয়ার করতে বলি।

তো, এই আবেদন ফর্ম এবং সিভি/রেজুমে -উভয়টাতেই অদ্ভুত সব কাণ্ডকারখানা দেখা যায়। কয়েকটা বলছি।

কয়েকমাস আগে। একটা পদের আবেদন বাছাই করতে গিয়ে একটা রেজুমে দেখে খুব চেনা চেনা লাগছে। কোথায় দেখেছি, কোথায় দেখেছি!? হঠাৎ মনে হল, আগে দেখা আবেদনগুলোর মধ্যেই ছিল। খুঁজে বের করলাম। দেখা গেল, দুইজন আলাদা প্রার্থী হুবহু একই সিভি দিয়েছেন। ফন্ট, কালার সব এক। শুধু নাম, পরিচয়ের তথ্যগুলো আলাদা। পরে আবিষ্কার করলাম, এই দুইজন বর্তমানে একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন! এঁদের সিভি কি সেই কোম্পানি থেকে দিয়েছিল নাকি?!

একটা সিভি পেলাম কটকটে লাল রঙের। প্রচুর লাল। মাঝে মাঝে লাল ফন্টে লেখা তো আছেই, নিজের ছবির চারপাশে লাল বর্ডার দিয়েছেন। সিভির নিচে একটা সিগনেচার আছে, সেটাও লাল!

একবার ডেভেলপার পদে একজনের সিভি পেলাম, যিনি সম্পূর্ণ অন্য ব্যাকগ্রাউন্ডের! আমরা যে ধরণের যোগ্যতাগুলো খুঁজছি, তার কাছাকাছিও কিছু নেই। এতোটা ভুল তো কারও করার কথা নয়। পরে বুঝলাম, উনি অন্যের সিভি মেরে দিয়েছেন। শুধু নাম চেঞ্জ করেছেন।

একটা সিভি পেলাম উল্টা। মানে পিডিএফ যেটা দিয়েছেন, সেটা আপসাইড ডাউন। একজন দেখলাম, প্রিন্ট করা সিভি থেকে মোবাইল ফোন দিয়ে ছবি তুলে সেটা পিডিএফ করেছেন। সিভির উপরে মোবাইল ফোনের নাম লেখা!

এর বাইরে প্রচুর সিভি থাকে, সেগুলো বিডিজবসের মতো সাইটগুলো থেকে অটো-জেনারেট করা হয়।

এ তো গেল সিভি/রেজুমের ব্যাপার। আবেদন ফর্মেও নানান কিসিমের তথ্য আসে।
কেউ হয়তো তার স্যালারি এক্সপেকটেশন লিখেছেন ৪ হাজার টাকা, একটা শূন্য দিতে ভুলে গেছেন। কেউ দেখা গেছে “কবে থেকে কাজে যোগ দিতে পারবেন” প্রশ্নের উত্তরে ১৯৯১ সালের একটা তারিখ দিয়েছেন। যেটা আদতে তাঁর জন্মদিন। কেউ আবার জন্ম তারিখের জায়গায় আজকের তারিখ দিয়ে বসে আছেন।

এঁদের মধ্যে অনেকেই আবার সরেস। নাম আরিফুল ইসলাম, লিঙ্গ (Gender) দিয়েছেন মহিলা (Female) 😎

কী আর কমু!!

মনডায় চায়- ২

কাস্টমার সাপোর্টে লোক নেব। জব পোস্ট করা হয়েছে। সেই লিংক ফেইসবুকে শেয়ার করেছি। একজন আমাকে মেসেজ দিয়েছেন- Hello bro!

আমার মাথায় দপ করে আগুণ ধরে গেল। আমি এসব ব্রো-ট্রো একেবারেই সহ্য করতে পারি না। ধৈর্য ধরে উত্তর দিলাম। উনি বাংলিশে যেটা লিখলেন, সেটা তরজমা করে বুঝলাম, উনি আবেদন করেছেন। আমার এক কাছের বন্ধুর রেফারেন্স দিলেন। তিনি যে এই কাজের জন্যে খুবই উপযুক্ত সেটাও বলতে ভুললেন না। আমি বন্ধুর সম্মান রক্ষার্থে এই প্রার্থীকে ইন্টার্ভিউতে ডাকলাম।

ইন্টার্ভিউ-এর সময় তাঁকে যতগুলো প্রশ্ন করা হল, তার একটারও উত্তর দিতে পারলেন না। আমি একটুও হতাশ হলাম না। এরকমই হওয়ার কথা ছিল।

কথাবার্তা শেষ করার পর উনি হ্যান্ডশেক করার জন্যে হাত বাড়িয়ে দিলেন। আমি হালকা অবাক হলেও হাত বাড়ালাম। এরপর ঘটল চূড়ান্ত অবাক করা ঘটনা।

আজকাল পাঞ্জা লড়ার মতো করে হ্যান্ডশেক করার একটা রেওয়াজ হয়েছে। কলেজ-ভার্সিটি পড়ুয়া “কুল” পোলাপানের স্টাইল। আপনারা যাঁরা বুঝতে পারছেন না, তাঁরা ছবিটা দেখলে আইডিয়া পাবেন। তো, আমাদের প্রার্থী আমার হাতটা মোচড় দিয়ে সেই কুল স্টাইলে নিয়ে গেলেন।

আমার মাথার প্রায় নিভে যাওয়া আগুনটা আবার দপ করে উঠল।

আমার অফিস সপ্তম তলায়। একবার ইচ্ছে করল, *** দিয়ে এই “কুল ব্রো”টাকে ৭ তলা থেকে *** দেই!

মনডায় চায়- ১

আমার ছোট প্রতিষ্ঠান। মোটামুটি সবকিছুই নিজেকেই সামাল দিতে হয়। নজর রাখতে হয় সবদিকেই। নতুন লোক নিয়োগ সংক্রান্ত কাজে সরাসরি যুক্ত থাকি। হরেক রকমের প্রার্থী দেখি আর ততোধিক রকমের তাদের চরিত্র। কিছু যেমন হাসির কারণ হয়, তেমনি কিছু প্রার্থীর কাজ-কারবার দেখে মেজাজ রক্ষা করা কঠিন হয়ে যায়। এরকম একজনের গল্প বলি আজ।

কয়েক মাস আগে। একজন ডেভেলপার নেব। অনেকগুলো আবেদন পড়েছে। বাছাই করা কয়েকজনের সাথে যোগাযোগ করা হল। যেহেতু অফিসে সাক্ষাত করার সুযোগ নেই, সবাইকে পরীক্ষামূলক কাজ দেওয়া হল। প্রত্যেকে আলাদা করে জিজ্ঞেস করলাম কে কতো সময় চান।

শর্ত হল এমন, কাজটা ঠিকঠাক করতে পারলে সেটার পারিশ্রমিক দেওয়া হবে। যতজন করতে পারবেন সবাইকেই পারিশ্রমিক দেওয়া হবে। তবে, যাঁর কাজ পছন্দ হবে তাঁকেই আমরা ফাইনালি রিক্রুট করব।

একজন প্রার্থী ছিলেন সাভারের। তাঁকে স্কাইপ কল-এ কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হল। তিনি তিন দিন সময় চাইলেন। তাঁকে সময় দেওয়া হল চার দিন।

ঠিক ২৪ ঘণ্টা পর মেইল করলাম, কাজের অগ্রগতি কী? বললেন, অর্ধেক প্রায় হয়েছে। কালকের মধ্যেই হয়ে যাবে।

আবার ২৪ ঘণ্টা পর ফলোআপ মেইল দিলাম। উনি বললেন, কাজ প্রায় শেষ। শুধু টেস্ট করতে হবে। আমি খুশিই হলাম।

পরদিন আবার মেইল দিলাম। উনি জানালেন, আধা ঘণ্টার মধ্যে হয়ে যাবে। আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলাম।

আধা ঘণ্টা গেল। এক ঘণ্টা গেল। দুই ঘণ্টা। এক দিন। দুই দিন। …
আজ অনেকগুলো মাস হয়ে গেল। সেই কাজের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। অনেকবার মেইলে, ফোনে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি। লাভ হয়নি।

এরা যে বলে বেড়ায়, চাকরি নাই, চাকরি নাই! এদের চাকরি দিবে কে?

মনডায় কী চায় বলেন? 😠
[ফুটনোটঃ আমরা এখনো কিছু পদের জন্যে লোক খুঁজছি- https://hr.codexpert.io ]

পরিস্থিতি

একটা পরিস্থিতি আপনাকে ভেঙ্গে ফেলবে নাকি শক্ত করবে, সেটা পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে আপনার উপর।

আগুন-পানিতে একটা কাঁচা, শক্ত আলু সেদ্ধ করলে সেটা নরম হয়। আবার সেই একই আগুন-পানিতে একটা নরম ডিম সেদ্ধ করলে সেটা শক্ত হয়ে যায়!

আমার দাদা

দাদাকে আমরা দাদু ডাকতাম। দাদুর বয়স কতো -এই প্রশ্নের উত্তরে সবসময়ই বলতেন আশি বছরের বেশি! বহু বছর ধরে দাদু এই হিসাবই দিয়ে গেছেন। প্রতি বছর ক্যালেন্ডার পাল্টেছে, কিন্তু তাঁর হিসাব পাল্টায়নি!

দাদুর ঝুলি ভর্তি অসংখ্য গল্প ছিল। বলা বাহুল্য, বেশিরভাগই জ্বিনভূত সংক্রান্ত গল্প। আমার ধারণা, আমি যে কালেভদ্রে টুকটাক গল্প লিখি, সেগুলোর অধিকাংশেই ভৌতিকতা কিংবা আধিভৌতিকতা আনার পিছনে এইসব গল্পের একটা ভূমিকা আছে।

কয়েকটা কথা দাদু প্রায়ই বলতেন। যেমন, তাঁর বালক বয়সে কে যেন (সম্ভবত কোনো ভিখারিনী) মাথায় হাত রেখে বলেছিল, তোর সাত ছেলেমেয়ে হবে। দাদু নিজে ছিলেন বাবা-মার একমাত্র সন্তান। এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর নিজের ছেলেমেয়ের সংখ্যা সাতে ঠেকেছিল। স্বভাবতই এই কালতাল তাঁকে চমৎকৃত করেছিল। এই গল্পটা আমরা অসংখ্যবার শুনেছি। আর অসংখ্যবার শুনেছি তাঁর মৃত্যুর দিনক্ষণের কথা। দাদুর বিশ্বাস ছিল তিনি চৈত্র মাসের শেষ শুক্রবারে মারা যাবেন!

যে সময়টার কথা বলছি, আমি তখন নাইন কি টেনে পড়ি। দিনরাত পড়াশুনার চাপে থাকতাম। সারাদিন এই স্যার-সেই স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তাম। দৌড়াদৌড়ির সুবিধার্থে আমাকে সাইকেল কিনে দেওয়া হয়েছিল। নীল রঙয়ের চমৎকার একটা সাইকেল।

দাদু সকাল-বিকেল দুবেলা বাজারে যেতেন। আমি যখন আরও ছোট, তখন প্রায়ই তাঁর সাথে যেতাম। একদিন দাদুর সাথে বাজারে গিয়ে হারিয়েও গিয়েছিলাম; সেই গল্প অন্যদিন বলা যাবে।

যা হোক- যেদিনের কথা বলছি, সেদিন কোনো কারণে দাদু সকালে বাজারে যাননি। দশটা-সাড়ে দশটার দিকে হঠাৎ তাঁর সিঙ্গারা খেতে ইচ্ছে করেছে। আমি সাইকেল নিয়ে গিয়ে সিঙ্গারা এনেছি। সিঙ্গারার প্যাকেটটা দাদুর হাতে দিয়ে আমি খেলতে গেছি।

হঠাৎ হৈচৈ। পুরো গ্রামের মানুষ আমাদের বাড়ির দিকে দৌড়াচ্ছে। আমি খেলা ফেলে ছুটে এলাম। এসে দেখি বাড়ি ভর্তি মানুষ। উঠোন পানিতে ভেজা। দাদুকে একটা চৌকিতে শুইয়ে রাখা হয়েছে। তার ঠিক পাশেই আমার সাইকেলটা দাঁড় করানো। আমি বাজার থেকে এসে যেখানে রেখেছিলাম।

শোরগোল থেকে যা বুঝলাম- সিঙ্গারা খেতে গিয়ে দাদুর গলায় আটকে গিয়েছিল। দাদুর গলায় প্রায়ই খাবার আটকাত। সমস্যাটা আমারও আছে, আমিও শুকনো খাবার খেতে পারি না। তো, সিঙ্গারা গলায় আটকানোর পর পানি খেয়েছেন, সেটাও আটকে গেছে। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ঢলে পড়েছেন। বাড়ির লোকজন নানান চেষ্টা তদবির করেছে, মাথায় পানি ঢেলেছে। কাজ হয়নি। কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা গেছেন!

আমি বাংলা দিন-তারিখের হিসাব রাখি না। কিন্তু, দাদু মারা যাওয়ার কিছুদিন পর হঠাৎ আবিষ্কার করলাম, তাঁর ভবিষ্যতবাণী পুরোপুরি মিলে গেছে! দাদু মারা গেছেন চৈত্র মাসের শেষ শুক্রবারে!

শুভাকাঙ্ক্ষী

সত্যিকারের শুভাকাঙ্ক্ষী বলতে যা বোঝায়, সেটা আপনার পরিবার। কাছের আত্মীয়স্বজনও কখনো কখনো শুভাকাঙ্ক্ষী হতে পারে বটে, তবে সেটার হার বেশ কম।

এতোটুকুই। এর বাইরে মন থেকে আপনার ভালো চায় -এমন মানুষ খুঁজে পাবেন না। আপাতত দৃষ্টিতে যাদেরকে বন্ধু ভাবছেন, খুব সম্ভবত তারা আপনার দুঃসময়ে থাকবে না। আপনাকে এক বেলা ভালো খেতে দেখলে, এদের অধিকাংশেরই রাতে ঘুম হবে না!

আপনার সুখ দেখে সুখী হবে আর আপনার দুঃখে কাঁদবে, এমন বন্ধু শুধু রাজ্জাক-ফারুক সাহেবদের সিনেমাতেই ছিল। বাস্তবে সম্ভব না।

আর এই জিনিসটা আপনি যতো তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করবেন, ততোই মঙ্গল।

জ্বিন

গ্রামে জ্বিন খুব সহজলভ্য বিষয়। সবার জীবনেই মোটামুটি কয়েকটা করে জ্বিনের গল্প থাকে। আমি গ্রামে বড় হয়েছি, স্বাভাবিকভাবেই আমাকেও জ্বিন আর জ্বিনের গল্পের মধ্যে দিয়েই বেড়ে উঠতে হয়েছে। এর মধ্যে লোকমুখে প্রচলিত গল্প যেমন আছে, তেমনি আছে কারও কারও প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য। আর এসবের বাইরে আমার নিজের আছে একাধিক অভিজ্ঞতা! বিশ্বাস করা-না করা অন্য প্রসঙ্গ, কিন্তু চোখের সামনে ঘটেছে বলে অস্বীকার করার উপায় নেই।

আমাদের বাড়িটা অনেক বড়। মোটামুটি দুই বিঘা জমিতে লম্বাটে বাড়ি। উত্তর-দক্ষিণ বরাবর টানা বারান্দা। বাড়ির উত্তরদিকে পৌনে এক বিঘা একটা পুকুর। এরপর চলাচলের রাস্তা। ইদানীং পুকুরপাড়ে গাছপালা বেড়েছে, বাড়ি পুরোটা দেখা যায় না। আগে নতুন কেউ এলাকায় এলে রাস্তা থেকে দেখে আমাদের বাড়িকে স্কুল মনে করত!

প্রসঙ্গে আসি।

আমাদের গ্রামে আব্দুল মজিদ নামে এক আলেম ছিলেন। মজিদ মৌলভী নামে চার-গ্রামে তার পরিচিতি ছিল। মৌলভী সাহেবের জ্বিন সাধনা ছিল। কথিত আছে, এই আব্দুল মজিদ পানির উপর দিয়ে হেঁটে বেড়াতেন! অনেকেই নিজের চোখে দেখেছেন বলে দাবী করেছেন। সব শোনা কথা।

৯৫-৯৬ সালের ঘটনা হবে। এক সকালে এই মৌলভী সাহেবের স্ত্রী মারা গেলেন। বিকেলে তাঁর দাফন হল। আমাদের বাড়ির উত্তর পার্শ্বে যে রাস্তার কথা বললাম, তারপরেই একটা বিল। বর্ষায় পানি হয়, বাকি সময় শুকনো থাকে। বিলের মাঝামাঝি কয়েকটা উচু জমি। তার একটাতে তাঁকে কবর দেওয়া হল।

আমি তখন অনেক ছোট। ওয়ান-টোয়ানে পড়ি হয়তো। সন্ধ্যাবেলা আমার বোনের সাথে বারান্দায় বসে পড়ছি। অন্ধকার রাত। তখন গ্রামে বিদ্যুৎ ছিল না। হারিকেন সম্বল।

আমরা বসেছি আমাদের বারান্দার একেবারে উত্তর দিকে। এর ঠিক পরেই পুকুর। যেখানে বসেছি, দিনের বেলা সেখান থেকে সরাসরি কবরটা দেখা যায়।

হঠাৎ দেখি, চতুর্দিক থেকে লক্ষ-লক্ষ, কোটি-কোটি আগুণের ফুলকি উড়ে আসছে। জোনাকি পোকার মতো। অসংখ্য। এসে কবরটা যেখানে, সেখানে নামছে। নেমেই মিলিয়ে যাচ্ছে। পুরো এলাকাটা আলোকিত হয়ে গেল। কয়েক মিনিট। তারপর সব শেষ।